মেনু নির্বাচন করুন

চাতলপাড় ইউনিয়নের ইতিহাস

 

অবিভক্ত বাংলার অন্যতম বৃহৎ নদী মেঘনার তীরে অবস্থিত চাতলপাড় তৎকালীন ত্রিপুরা জেলার একটি ইউনিয়ন। রাজধানী কোলকাতা থেকে সুদূর করিমগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তত ভূখন্ডের যোগাযোগের মাধ্যম ছিল একমাত্র নদীপথ। চাতলপাড় ষ্টিমারঘাট থাকায় ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এর গুরম্নত্ব সীমাহীনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। ক্রমে চাতলপাড় বাজারটি বিশাল হয়ে উঠেছিল এবং এর ব্যাপ্তি ঘটেছিল আশেপাশের বেশ কটি জেলায়। ‘‘সোনালী আশ’’ নামে খ্যাত পাটের ফলন এই এলাকায় অধিক হওয়ায় বৃটিশ সরকারের অনুমোদিত ‘‘আরসিম’’ ‘‘ডেভিট’’ ও ‘‘লোক’’ সাহেবের কোম্পানী নামে তিনটি বিখ্যাত জুট কোম্পানীর অফিস চাতলপাড়ে স্থাপিত হয়েছিল। ফলে চাতলপাড়ের বাণিজ্যিক পরিচিতির মাত্র অধিক বৃদ্ধি পায়। বৃটিশ সরকার কর্তৃক এখানে গড়ে উঠেছিল সাব পোষ্ট অফিস ও টেলিগ্রাম অফিস। এ সমসত্ম অফিস কর্মচারীদের জন্য আবাসিক সুযোগ-সুবিধা ও করা হয়েছিল। ষাটের দশকে টেলিফোনের খুটিগুলো বিদ্যমান থাকলেও পরবর্তীতে সরকারি নেক্ নজরের অভাবে হাওয়া হয়ে গেছে। পোষ্ট অফিস এর অবস্থা বড়ই করম্নন। যা হউক দুই বাংলার কেন্দ্রবিন্দু কোলকাতার সাথে এ জনপদের পরিচিতি সহজতর বলা বাহুল্য।

চাতলপাড় গ্রামটি বৃটিশ আমলে সম্পূর্ন হিন্দু অধ্যুষিত হলেও এই ইউনিয়নের অমত্মর্গত প্রায় প্রতিটি গ্রামেই হিন্দু ও মুসলমানদের বসবাস। তবে এই গ্রাম সমূহে মুসলমানরাই সংখ্যাগরিষ্ট। চাতলপাড় এলাকার মানুষের মধ্যে ধর্মীয় ক্ষেত্রে সোহার্দ্য ও সম্প্রীতি বিদ্যমান সর্বকালেই। রাজনৈতিক উথান পতনে বা দেশ ও দেশের বাইরে অনাকাঙ্খিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হাঙ্গামা থাকলেও এই এলাকায় কোনদিন এর প্রভাব পড়েনি। দেশ বিভাগের পর অর্থাৎ পাকিসত্মান আমলে চাতলপাড় গ্রামের অনেক হিন্দু পরিবার ভারত চলে গেলে আশে পাশের অন্যান্য গ্রামের অনেক মুসলিম পরিবার বসতি স্থাপন করে। ফলে গ্রামটি হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের বসবাস ভূমিতে পরিণত হয়। চাতলপাড় বাজারের পূর্বদিকে অবস্থিত বিরাট আখড়া ছিল হিন্দু সমাজের ধর্মীয় মিলন মেলার কেন্দ্রবিন্দু। তাছাড়া চাতলপাড় গ্রামের বাবু বঙ্কবিহারী রায়েবোড়ি, বাবু পঞ্চানন্দের বাড়ি, পোদ্দার বাড়ি, বাবু রামকৃষ্ণ রায়ের (বাঘওয়ালা দালাল) বাড়িতে অনুষ্টিত শারদীয় উৎসবসহ বিভিন্ন পূজা-পার্বনে স্বতস্ফূর্ততা ও উৎসবমুখর পরিবেশ ছিল সর্বজনবিদিতঅ চাতলপাড়ের চৌদ্দমাদল উপলক্ষে জমা মেলা হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের কাছে আনন্দ উপভোগের বিষয় ছিল।  উভয় সম্প্রদায় তাদের ধর্মীয় আচার অনুষ্টান পালনে স্বচেষ্ট ছিলো। জ্ঞান তাপস শাহসূফী হযরত সৈয়দ মিরাণ শাহ তাতারী (রঃ) এর আগমন এই দেশের জন্য বিরাট এক জাগরণ। সুদূর রাশিয়র তাতার মুলুক থেকে উত্তর ভারতের রামপুর এ্যাষ্টেটের জমিদারী পরিত্যাগ করে বাংলায় ধর্ম প্রচার করতে গিয়ে কচুয়ার মাটিতে চিরশায়িত হয়ে এই অঞ্চলের শান-শওকত ও পরিচিতি বহুল পরিমাণে বৃদ্ধি করেন।

স্মরণ করা যেতে পারে যে, মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে ইংরেজগণ ব্যবসা বাণিজ্যেক অুমোদন লাভ করেছিল। কিন্তু তাদের দূরভিসন্ধি ছিল এ দেশের শাসনভার কেড়ে নেয়া। ১৯৫৭ সালের ২৩ জনু পলাশীর আম্রকাননে বাংলার স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ্ দৌলার সহিত যে যুদ্ধ সংঘটিত হয় সেই যুদ্ধের ফলাফল স্বরূপ বাংলা বিহার উড়িষ্যার রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ইংরেজদের হাতে চলে যায়। শুধু তাই নয় গোটা ভারত বর্ষেই বণিকের মানদন্ড রাজদন্ডের রূপলাভ করে। ভারতবর্ষ হারিয়ে ফেলে স্বাধীনতা। ঔপনিবেশিক ইংরেজ বেনিয়াদেরকে বিতাড়িত করে ভারতবর্ষকে স্বাধীন ও মুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে শুরম্ন হয় সংগ্রাম। স্বাধীনতা আন্দোলনের ঢেট চাতলপাড়েও এসে লাগে। চাতলপাড় এলাকায় কংগ্রেস, মুসলিমলীগ, ও নেতাজী সুভাষ বসুর রাজনৈতিক দলের শাখা গঠিত হয়। ‘‘ বন্দেমা তরম, হাতমে বিড়ি মোমে পান, লেকড়ে ল্যাংগে পাকিসত্মান’’ বহুল প্রচারিত সেণাগানগুলো এ জনপদের হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মুখে মুখে ছিল। ইংরেজদের বিরম্নদ্ধে স্বসস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার দৃষ্টামত্ম ও চাতলপাড়ের রয়েছে। নেতাজী সুভাষ বসুর একনিষ্ট কর্মী বাবু যোগেন্দ্র আচার্য্য ইংরেজদের  বিরম্নদ্ধে স্বসস্ত্র সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। নিজের তৈরি বোমার অকস্মাৎ বিস্ফোরনে তিনি নিহত হয়েছিলেন। বাবু কানাই লাল রায় সহ অনেকেই তখন নেতাজীর সংগঠনের কর্মী ছিলেন। জনশ্রম্নতি আছে বিপস্নবী উলস্নাস কর দত্ত যোগেন বাবুর সহিত প্রত্যক্ষ যোগাযোগ রাখতেন। যোগেন বাবুর বাড়িতে নির্মিত একটি স্মৃতিসত্মম্ব দীর্ঘদিন থাকলেও বর্তমানে তার অসিত্ম নেই। কোলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘‘ছায়াপথ’’ নামক পত্রিকার কার্যক্রম চলত চাতলপাড় থেকে। উপনিবেশিক বৃটিশ শাসনের নাগপাশ থেকে মুক্তির আন্দোলনে চাতলপাড়বাসীর সক্রিয় অংশ গ্রহনের করে ছিল। হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের তীব্র আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৮৭ সালের ১৪ আগষ্ট ও ১৫ আগষ্ট পাকিসত্মান ও ভারত নামে দুটি স্বাধীন রাষ্টের জন্ম হলে আমরা পাকিসত্মানের অমত্মর্ভুক্ত হই। কিন্তু তাতেও আমাদের ভাগ্যের পরির্বতন হলোনা। পাকিসত্মান রাষ্টের জনক মিয়া মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ কর্তৃক ‘‘ উদুই হবে পাকিসত্মানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’’ এ ঘোষনার ফলে আমাদের মাতৃভাষা পদদলিত হবার আশঙ্কা দেখা দিলে ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রম্নয়ারী সালাম, জববার, বরকত, রফিক, শফিউরসহ অনেকের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমাদের বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা লাভ করে। রক্তঝরা এ দিনটি বর্তমানে ‘‘আমত্মর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’’ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। আমাদের এই মহান জাতীয় আন্দোলনে ভাষা সৈনিকদের মিছিলে চাতলপাড়ের কৃতি সমত্মান তৎকালীন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র ডাঃ মোঃ আলতাফ হোসেন, ঢাকায় মাদ্রাসা-ই-আলীয়া ছাত্রাবাসের ভি.পি আলহাজ্ব মাওলানা আব্দুল হাফেজ (শহীদ মিয়া) এবং ঢাকায় অধ্যয়নরত জনাব এ.কে.এম ইউনুছ মিয়া অংশ গ্রহনের গৌরব অর্জন করেন। তারপর ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রট নির্বাচন,১৯৬২ সালের শিক্ষা কমিশন আন্দোলনে চাতলপাড়বাসীর স্বতঃর্স্ফূত অংশ গ্রহণ ছিল। ১৯৬৯ সালের ৬দফা ও ১১ দফা তথা আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে চাতলপাড়বাসী অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।

সমগ্র এলাকাটি মিছিলে, শেস্নাগানে সরগরম হয়ে উঠেছিল। ঐতিহাসিক এ গণঅভ্যথানে যারা গুরম্নত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন তাদের মধ্যে সর্বজনাব মোজাম্মল হক তালুকদার, মোঃ হাবিবুর রহমান, আশরাফ উদ্দিন আহমদ, মোঃ তাবারক আলী খন্দকার, মোঃ আব্দুল লতিফ, মোঃ ফরিদ উদ্দিন পাঠান, মোঃ আবু শ্যামা, আব্দুল মালেক সরকার, মোঃ আবু তাহের, মোঃ আব্দুস শুকুর, মোঃ জয়নুল আলম, মোঃ মোসত্মাফিজুর রহমান, আবদুল ওয়াদুদ ভূইয়া, মোঃ জহিরম্নল হক, আবু বকর কানু, শওকত হোসেন, বিমল রায়, ছোট্র মাষ্টার, শহীদ উদ্দিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র জনাব মুহাম্মদ মুজিবর রহমান (পরবর্তীতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ), ভৈরবের ছাত্র নেতা জনাব মোঃফয়সান এবং অষ্টগ্রামের ছাত্রনেতা জনাব বাচ্চুর সংগ্রামী বক্তৃতা এ আন্দোলনের গতিকে বেগবান করেছিল।

 

চাতলপাড় এলাকাটি ভাটি অঞ্চলের অজপলস্নীতে হলেও এর পরিচিতি ব্যাপক হওয়ায় বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রের বা সমাজের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গের আগমন ঘটেছে। ষাটের দশকে পূর্ব পাকিসত্মানের গর্ভণর আবদুল মোনেম খান জাহাজ যোগে চাতলপাড় এসেছিলেন। ১৯৭০ সালের ৫ অক্টোবর সাধারণ নির্বাচনের প্রচারাভিযানে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দসহ লঞ্চ যোগে চাতলপাড়ে এসেছিলেন। প্রতিকূল আবহাওয়া, ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষ বঙ্গবন্ধুকে কাছে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়েছিল চাতলপাড়ের মানুষ। আলহাজ্ব মাওলানা আব্দুল হাফেজ (শহীদ মিয়া) এর সভাপতিত্বে বাজার মসজিদের পশ্চিম দিকে অনুষ্টিত এ সভায় বক্তব্য রেখেছিলেন জনাব মোঃ জুমন আলী, জনাব মোজাম্মেল হক তালুকদার (সফিক), তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জনাব মুসলেহ্ উদ্দিন আহমেদ, এম.পি পদপ্রার্থী জনাব মোজাম্মল হক (কাপ্তান মিয়া), এম.এন.এ পদপ্রার্থী জনাব তাহর উদ্দিন ঠাকুর এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। প্রধান অতিথি বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের বক্তৃতার মধ্য দিয়ে বিশাল জনসভার পরিসমাপ্তি ঘটেছিল। ৭০ এর নির্বচনী প্রচারে ন্যাপের কেন্দ্রীয় নেতা দেওয়ান মাহাবুব আলী, কুতুব মিয়া, নেজামে ইসলাম পাটির কেন্দ্রীয় নেতা মাওলানা আশরাফ আলী ধরমন্ডলীসহ অনেক বিজ্ঞ নেতা চাতলপাড়ে আসেন। দেশ বিভাগের পর বিভিন্ন সময়ে চাতলপাড় ছেড়ে যারা ভারতে অবস্থান করেছেন তাদের মধ্যে অনেকেই অত্যমত্ম সুনামের সহিত থাকলে ও জন্মভূমির মায়া ছিন্ন করতে পারেননি। ডাঃ মুকন্দ লাল রায় চাতলপাড় ছেড়ে গেলেও জন্মভূমির টানে এসেছিলেন। চাতলপাড় সাব-পোষ্ট অফিসের পোষ্ট মাস্টার বাবু বীরেন্দ্র ভৌমিকের পুত্র বাবু বিবেকানন্দ ভৌমিক কোন এক সময় ত্রিপুরা রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী হয়েও তাঁর জন্মভূমির মায়ায় চাতলপাড় এসেছিলেন।

 

 

চলবে..........................................